ঢাকা , রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ , ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন দুর্গাসাগর দীঘি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৪-১৯ ১৬:০২:৪৮
ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন দুর্গাসাগর দীঘি ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধন দুর্গাসাগর দীঘি
নিজস্ব প্রতিবেদক
বরিশালের বাবুগঞ্জের মাধবপাশা ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী দুর্গাসাগর দীঘি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণ করে দীঘিটি। প্রতিদিন এ দীঘির বিশালতা ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূরদূরান্ত থেকে শত শত মানুষ ছুটে আসেন। খননের পর দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এটি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দীঘিটি জেলার ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

জানা যায়, স্থানীয়দের পানি সংকট নিরসনে ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি তৎকালীন চন্দ্রদ্বীপের রাজা শিব নারায়ণ তার স্ত্রী রানি দুর্গাবতী দেবীর নামে একটি বিশাল দীঘি খনন করেন। সে থেকেই এটি ‘দুর্গাসাগর’ দীঘি নামে পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, রানি দুর্গাবতী একবারে যতদূর পর্যন্ত হেঁটে গিয়েছিলেন, ততদূর পর্যন্ত দীঘিটি খনন করা হয়। সে আমলে এটি খননে ব্যয় হয় তিন লাখ টাকা। প্রায় ৪৫.৪২ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই দীঘির মাঝখানে রয়েছে একটি ছোট্ট দ্বীপ। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আবাসস্থল গড়ে উঠেছে। শীত মৌসুমে হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। বিস্তীর্ণ জলরাশি, সবুজ প্রকৃতি, নীল আকাশ এবং ছায়াঘেরা পরিবেশ মিলিয়ে এখানে সৃষ্টি হয়েছে মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। তবে বর্তমানে পরিবেশ বিপর্যয় ও পাখি শিকারিদের উৎপাতে অতিথি পাখির তেমন একটা দেখা মেলে না।

জেলা প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দীঘিটি ৪৫ একর ৪২ শতাংশ জমিতে অবস্থিত। এর ২৭ একর ৩৮ শতাংশ জলাশয় এবং ১৮ একর চার শতাংশ পাড়। দীঘির উত্তর-দক্ষিণ পাড়ের দৈর্ঘ্য ১৪৯০ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রশস্ত ১৩৬০ ফুট। দীঘির চারপাশ দিয়ে হাঁটার জন্য এক দশমিক ছয় কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। মাঝখানের ছোট্ট দ্বীপটি দীঘির সৌন্দর্যকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

দুর্গাসাগরের আশপাশে রয়েছে প্রাচীন রাজবাড়ি, পুরোনো মন্দির, বিভিন্ন পুরাকীর্তি ও শতবর্ষী বৃক্ষ যা ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের কাছে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রতিবছর শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য দর্শনার্থী ঐতিহ্যবাহী এই স্থানটি দেখতে আসেন। অবসর সময় বা ছুটি কাটাতেও অনেকেই ছুটে আসেন।

পর্যটন উন্নয়নের অংশ হিসেবে দুর্গাসাগরের আধুনিকায়নে বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পর্যটন করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক রেস্ট হাউস, নান্দনিক প্রবেশদ্বার, ডিসি মঞ্চ ও হলরুম। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য বসানো হয়েছে সিসিক্যামেরা। দর্শনার্থীদের বিনোদনের কথা বিবেচনায় পিকনিক স্পট, শিশুদের খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন রাইড স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া খাঁচায় হরিণ ও বানরসহ নানা আয়োজন পর্যটকদের জন্য বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে কিছু বখাটে বিনা টিকিটে দীঘি এলাকায় ঢুকে পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করে থাকে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্গাসাগরের পাশের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট রাতে দুর্গাসাগরে হরিণের খাঁচা থেকে একটি হরিণ চুরির ঘটনাও ঘটে। এতে সেখানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন।

হরিণ চুরির পর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা জোরদারসহ ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। এ ঘটনায় মামলা হলেও হরিণটি উদ্ধার বা ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

রায়হান তালুকদার নামে এক পর্যটক আমার দেশকে জানান, তিনি যশোর থেকে দুর্গাসাগর দীঘি দেখতে এসেছেন। এর আগে তিনি উজিরপুরের গুঠিয়া মসজিদ কমপ্লেক্স দেখে এসেছেন। একই সড়কে গুঠিয়া মসজিদ ও দুর্গাসাগর দীঘির অবস্থান হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যে পর্যটকরা দুটি স্থান পরিদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন।

দুর্গাসাগরের দীর্ঘদিনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুবিধা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, অতীতের তুলনায় দুর্গাসাগরে দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে পর্যটন খাতে দুর্গাসাগর থেকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়ছে। প্রাচীন ঐতিহ্য, ইতিহাস ও অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে দুর্গাসাগর দক্ষিণাঞ্চলের সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



















 

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ